Shongkochur Emam

সুবর্ণ আদিত্যের নতুন কবিতা

Posted 11 months ago

14,169 total views, 22 views today

সাধারণত ব্যক্তিগত ওয়েবে সবকিছুই নিজের থাকে। কিন্তু যখন তা গণ করা হয়, আদতে কি আর তা নিজের থাকে? আমার মনে হয় থাকে না। তা সবার হয়ে যায়। হ্যা, এজন্য আমার এই ওয়েবে নিজের লেখালেখির পাশাপাশি অতিথি লেখকের লেখাও থাকছে। তাই বিভাগটির নাম দিয়েছি ‘প্রিয় অতিথি’। এখানে মাঝে মাঝে লেখার নিমন্ত্রণ করা হবে প্রিয়দের। তারা আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে প্রকাশ হবে তাদের লেখা। শুরুতেই থাকছে কবি ও সাংবাদিক সুবর্ণ আদিত্য-এর ৯টি নতুন কবিতা। কবির জন্য শুভকামনা থাকলো

বনসাই চিৎকার

নথের দিকে যে ঘুম—তারও গভীরের বনে এক গৃহস্থালি চোখের প’রে পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে নদী। ঘুমের সাথে নদীর যত্ন আছে। বলা যায়: দূরনিকটে লবন সম্পর্কিত বাদাম ফলের যোগসূত্র থেকে ছিটকে আসা চুমুও অবিকল চুমুর মতোই। অথচ তুমিও একটা পাখি—জানা নেই কারও, ডানা নেই—এমন এক পাখির দুঃখ বয়ে বেড়ায় গাছ। শেকড় আছে বোলেই চলাচল নেই আকাশে, মাটির কান্না অনুবাদ করে করে ফল-ফুল ও ছায়া দিয়ে যায়। ছায়াফুলে পৃথিবী থেকে সিক্সটি ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে ঘুরে বসে তুমিও গাইছো বনসাই চিৎকার। এক নাবিক তৈরি হয়েছিল গন্তব্য—ফুল-ফল-লতায় শহরের দিকে শুশ্রুষা নিয়ে উড়ে যাওয়া প্রজাপতি থইথই করছিল নদীসংগীত। যেকোনো কান্নাকে তুমি বর্ষা নামে ডাকো, তামাম সুন্দরকে বলো নারী—নথ নিয়ে ঘুমন্ত তুমি সব সৌন্দর্যকে জয়ী করলে সমস্ত এবাদতনামা আনাগোনা করে ঘুঙ্গুরে।

মানুষ তোমার দিকে, গাছেরা মেঘের দিকে এগিয়ে যায় কেবল একটা ব্যাঙ—একা একা দেয়াল ভেঙে পৃথিবী হয়ে গেল।

তানপুরা


সমস্ত স্বরের ভেতর জেগে আছে একটা গাছ। পাখিদের থেকে স্যাডনেস নিয়ে একাই গন্তব্যে যাচ্ছে জোনাকের বসন্ত। তিতিরের ভোর বিষয়ক গান, ফোঁকগলা, ঢেউয়ের আস্তরণ খুলে সাগরে নেমে পড়ছে লবনসেতু। কেবল লবনই পানিকে দুইভাগে ভাগ করতে পারে—জেনেছে স্বর্ণ ময়ুর। একটা যুদ্ধের ভেতর, পাখির আকার আর চালনাসহ বিবিধ চিত্র নিয়ে উড়ে আসে বৈমানিক। প্রধান বাতিঘরে মানুষের ম্যুরাল পড়ে থাকে, যাদুঘরে—ঘর করে আরো বহুপ্রাচীন সভ্যতা।

তোমাকে, যেবার প্রথম ইশারা দিয়েছিল মাছরাঙ্গা চোখ—আবহাওয়াগান নিয়ে যারা গেয়ে উঠেছিল তীব্র বিপ্লব…!  তাদের মনে পড়া, খুব সকালে, পাতাঝরা রাস্তায় টুংটাং একটা সাইকেল—
গড়িয়ে গড়িয়ে পথ হয়ে গেল…! প্রজ্ঞাপণ ছাড়াই দেশের ভেতর তুমি একটা সতন্ত্র দেশ—কাঁটাতার ছাড়াই তুমি একটা সরল সীমান্ত—অতিথি পাখি নও, পাখি…যেকোনো ঋতুতে নাতিশীতেষ্ণ অধ্যায়। তোমাতে যুদ্ধ কেন তবে বলো!

তুমি যেকোনো শ্রমিকের ঘাম। অনাগত ফসল, তুমি বিস্তৃর্ণ ক্ষেত-একান্ত আদর—প্রিয়ার ঢুলুঢুলু চোখ। তুমি নিজস্ব প্রেম। বরং মদের গ্লাসে তোমাকে উল্লাস করে বলা যেতে পারে, ডিয়ার, ডু ইউ হ্যাভ অ্যা লাইটার? …সমস্ত স্বরের ভেতর মানুষ, মানুষের ভেতর তুমি একটা গাছ, আমি একটা গাছ—আমাদের শেকড়ের নাম প্রেম, সংবিধানের নাম ভালোবাসা। পাখিরা গাইবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, শুকনো পাতার ঝনঝন আমাদের রণসঙ্গীত।

ধীরাশ্রম

প্রত্যাখানের ঝমঝম ডালা থেকে নেমে আসে রাতের গল্প—
আমরা বসে থাকি, মুখোমুখি; নিরবে কথা হয় ঝুপঝুপ বৃষ্টিছায়ায়
এই যে দূরত্ব…! তার কাছাকাছি থাকে সমূহ স্থিরতা—পুরোনো আসবাবের গন্ধের তীব্রতায় মূক হতে থাকে আলেখ্য
চিবুকের ন্যায় আমরা ঝানু হতে থাকি মগডালের হাওয়ায়।

তুমি বেয়ে উঠে যেমন গাছ হয়ে যাই, সরল এক গাছ—যেকোনো শুভ্র হাসির মতো-নিক্বণ, নুড়ি পাথরের গুণগুণ ধ্বনি
হয়ে যাই স্বর্নিবন্ধ দরজা-দরাজের মাস্তুলে আটকে থাকে উল্লাস
অভিবাদনের স্বরে-সুরে এলোকেশি এক কেয়াফুল সাঁতরে যাচ্ছে তৃণমূল থেকে গঙ্গায়…!

ঝিঁনুকের শাপে-অভাবে, অনাগত, আরো বিজন ছাতাপাহাড়ের ডাক তুলে আনছে চাতক—
পাখি বন্দনার নাম- পড়, আর কুয়াশার স্কুলে ঝরে গেছে শেষ শিশিরঝাঁক, বুনোমাতাল, খয়েরি, পানের সুরকি হয়ে আসছে ব্যাকুল নহর—নোঙ্গর তুলবে, ঢেউসম, সমুদ্রসমগ্র আকাশ

প্রার্থনার চোখে, রেখেছে, তীর্যক ফলা, জ্বলে যাচ্ছে, জলের অতল, তিলের ঘুমসম্ভার!
তোমার নাবিক কই মেয়ে? সমুদ্রের বাগানে ফুলে আছে চোখের রোগ—রোগের আয়ু পড়ে থাকে তীরে-বালুময় ধুঁধুঁ নিরীহ চিৎকার ফেরে ঘরে—একা

পুরোনো—শীতের আগমনের মতো, বের হয়ে আসে, ধীরে, যেন মায়ের শাড়ীতে ন্যাপথলিন ঘ্রাণ, মৌলিক ক’রে তোলে স্মৃতির মনন
ফিকে-ক্লিশে, আরো বিবিধ ময়লা আস্তরণ, ভেদ করলে দগদগে ক্ষত ফেলে উঠে আসে পেরেক—দেয়াল থেকে

চুমুর কোনো ঋতু থাকে! কিংবা শুশ্রুষা? থাকে বোধহয়…
কেবল জামা থেকে দাগ
দাগ থেকে ডিটারজেন্ট সুবাস
তোমাকে মনে করিয়ে দেয়—দীর্ঘ দহন
আড়ালের মত—
তবু, সামনে এসে দাঁড়াও—তুমি, সমগ্র তুমি

যাদুবিশ্বাস সংক্রান্ত শাস্ত্র

শামুকের মত হেঁটে ঠিক আমিও পেয়ে যাবো

দন্তের সাজা—ঠোঁটমইেড ব্যারিকেড

গতিকপয়, নিচুরারণে কূলের কাছাকাছি মৎসকামি স্কুল,

তারকারাজিরা গীর্জার ঘণ্টা কোথা থেকে নামিয়ে আনে ত্রিকোণসংগমে। অনিত্যতা নিয়ে আরো চাবিবাজ তেল ও তালা

খেলায়—ধাওয়া নেয় চোখ।

খুনির মশালে আলো নিয়েছে অন্ধকারের সাধক

অপায়ে উড়ে আসে তুলাগাছ। বীজের ভেতর চিন্ময় ব্যথা উপশম চাবুক খেলিয়ে নিয়েছে যাদুবিশ্বাস সংক্রান্ত শাস্ত্রের।

এক হন্তদন্ত, ছোঁটে—ছোড়াগুলির আকার নিয়ে

কামানের খোঁজে। বায়ুথলী ছিলো যার, সেও অংকন নিয়ে প্রজাতির উদ্ভব—সন্দেহে লেখে।

আরো পথ, নিশানার দিক ভুল কোরে যায় রাস্তা,

তীরের নরম বেগ বেগবান স্রোতে ঢলে গেলে

মানুষও নত হতে থাকে।

বিমত নিতে হবে জেনে, তোমার অসাদৃশ্যের ভেতর উজ্জ্বলতা

দূরত্ব রেখে যায় এবং চিবুকের একটু উপরে এসে থামে ট্রামের হুলিয়া।

এতক্ষণে আমিও তোমার কোমর খসিয়ে ভেঙে দিয়েছি সুপেয় ব্যারিকেড।

রান্নাঘরের কৌতুক

আরো সবুজ আলোর কাছাকাছি মানুষের বসবাস পড়ে থাকে

ঘন পুকুরের সাঁতার শেষ করে

নদী তুলে রাখে ঢেউ

মরমি হাওয়ায়

নিভৃতেই যেসব পশু ও প্রাণী খুলে রাখে আত্মজ

তারাও একদিন মানুষের সাথে কথা কয়—

কি কি কথা হয়? এইরূপ অনুগামী ফ্যান্টাসির ভেতর-বাইরে যা থাকে

তা মূলত রান্নাঘরের কৌতুক

ত্রিবিধ কৌশলে মানুষ তার আশপাশের অমনুষ্য প্রাণসমুহকে

রসুইঘরে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে…

আমি মানুষ হলে হয়তো পশুদের ঘরেই দাওয়াত

নিতাম—মানুষ হবার জন্য

ডাইভারশন চলছে  

তুমি ফুরালেই বন। এমন নির্ঘাত বিভাজনে চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে শরীরে বর্ষা মেখে দাঁড়াও। হেলতে দুলতে থাকা নদীটি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে গেলে একটি বিষন্ন হাসনাহেনার কাশিতে জেগে ওঠে দূরের সৌরজগত—এসব দেখতে দেখতে ধীরে সবজি কাটি।

আমার মায়ার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাও। একটি অপরিপক্ক ছানা—যার চোখ মেলা বারণ—ভালোবাসার মত এক প্রধান রোগে তুমিও আক্রান্তদের নীল বৃষ্টি—যাকে কান্নার সাধনা বলে ডাকো।

তোমাকে ইনস্টল করে গোপন ফোল্ডারে হাইড করি।
আমার রান্না শেষ। কাহলিল জিবরানের পিডিএফ সংস্করণে তোমাকে নিয়ে গেছি সাতান্ন পৃষ্ঠায়…

এখানে আমি ফুল আর তুমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত একটা দশমিক—তারপাশে সাতটি শূন্যের পর আমাদের প্রেমের সংখ্যা ঝুলছে মাশ্চেরাইজার নিয়ে। ত্বকের পরিপাটিতে ভাগ চিহ্নে দন্ডায়মান বানরটি গোলাপ নিয়ে অপেক্ষায়।

যতি চিহ্নের ভর মেপে ফর্মালিন খেয়ে বুলবুলি খাঁচায়…

তুমি ফিরলেই আকাশ বড় হয়ে যায়। আমাদের জ্যামিতি হয় না। ব্যাসার্ধবিশিষ্ট বাগানের চেহারায় নিট রানরেটে হইচই। উৎসে—ক্লান্তিকে ব্রাকেটে রেখে
ভাত খেয়ে হাত ধুতে গিয়ে ভাবলাম—প্রতি বলে-বলে তোমাকে চুমু খাওয়া দরকার।

খাদ্য সংকট


পৃথিবীটা বাকি রেখে মহাবিশ্বটা মুড়িঘণ্ট করে দুয়েকবার খেয়েছি।
আরো অনেক গ্যালাক্সির গতি ঘুরিয়ে ছায়াপথ, নক্ষত্র আর উল্কাপিণ্ড নাড়ুর মত চালান করেছি পেটে।
সুস্বাদু হ্রদগুলি এক চুমুকে সাবাড় করেছি—
খাইনি কেবল পৃথিবী। এখানে আছে সৌদি আরব, ইসরায়েল-আমেরিকা, এখানে থাকে মানুষ, থাকে বঙ্গবন্ধুর খুনি, আলকায়েদা, আইএস-জামায়াত

বিশ্বাস করুন—খাবারে রুচি হয় না।

ধীবর

তোমার পথ চেয়ে খুলে রেখেছি চোখ
এমন তিরতির দাও, ঘুমভর্তি আলো, ছোপছোপ দাগে রাত—রাতের কাছে এসে ছাউনি তুলছে ধীবর। গুণ্ঠন নামের এক ক্ষুধার্ত রাস্তা—বেমালুম করে দ্যায় পথ ও পথিক।

সেবারও সন্তোষপুর, নন্দন আর ঘাটালের মাঠে জেগেছিল জোনাকির স্রোত—শুধু একটা কথা আমি তো ভুলিয়ে দেবো ভেবেছি…!

অকস্মাৎ দেখি, এক মহীরুহ, তীরে দাঁড়িয়ে গেলেই আমাদের ঈশারায় দুলতে থাকে সিম্ফনি।

মানুষ—এমনই এক ব্যাধি, ভালোবাসায় বাঁচে না, মরে যায় কেবল শিকারীর ধনুকের মতো।

আগুন

সুবর্ণ আদিত্য

আগুনকে গোসল করাতে গিয়ে হাপিয়ে উঠছে পানি। পানিতে লবন কম থাকায় চিনির দাবীতে গোসল বর্জন করেছে আগুন। আগুন-পানির এমন বৈরী আচরণকে উড়িয়ে দিয়ে লাপাত্তা হয়েছে হাওয়া। বাজারে এখন দেশলাই, বোতলজাত পানি এমনকি

এয়ারকুলারেরও যোগান নেই। এমনই ক্রমসঞ্চয়ী পরিস্থিতিতে মানুষ চলে যাচ্ছে আদিতে-আমিত্ব থেকে বেড়িয়ে আসছে একটা ধবধবে সর্বজনীন সভ্যতা। তোমাদের চাহিদা মাফিক: পাথর, বেলে মাটি আর আতশকাঁচের চাষ নিয়েছি সর্বাঙ্গে। এখন যুগ কেবলই ঘষামাজার। সুরত বদলে যাচ্ছে মানুষের: চেহায়ায় কেবল কোমলতা, পরস্পরের জন্য মায়া আর ভালোবাসা। ধর্ম বলতে কেবল বাঁচা- ভরপুর থাকা একে অন্যের ভেতর।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •